হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইয়েমেনের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতের পরিস্থিতিতে সৌদি আরব কয়েক মাস ধরে সংকটের মধ্যে রয়েছে। দেশটির শাসকদের অহংকার ও একগুঁয়েমির কারণে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সৌদি বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী আমিন আল-নিমর।
তিনি ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিপুল ব্যয় এবং পবিত্র দুই মসজিদের মর্যাদাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের সমালোচনা করে বলেন, সৌদি শাসকদের শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ গ্রহণ করতে হবে।
ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেয়নি সৌদি আরব
ইয়েমেনের বিরুদ্ধে অতীতের সামরিক জোটগুলোর প্রসঙ্গ তুলে আমিন আল-নিমর বলেন, সমুদ্রে ইহুদিবাদী ইসরায়েলি সরকারকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে গঠিত একটি জোট মাত্র প্রায় এক মাস স্থায়ী হয়েছিল। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক শক্তি হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ওই জোট থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়।
তিনি বলেন, এর বিপরীতে পশ্চিমা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল সৌদি শাসকগোষ্ঠী অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি। ২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালিয়ে আসার পরও তারা নিজেদের আক্রমণাত্মক নীতি থেকে সরে আসেনি।
এই সৌদি বিরোধী কর্মী আরও বলেন, ইয়েমেনের সঙ্গে দীর্ঘ ১০ বছরের যুদ্ধের ফলে সৌদি আরব যে ক্ষতির মুখে পড়েছে, তা দেশটির অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্যও উদ্বেগজনক। বিশেষ করে ‘ভিশন ২০৩০’ এবং নিওমের মতো বৃহৎ অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে চাপের মুখে পড়েছে।
তাঁর মতে, অব্যাহত যুদ্ধ এসব প্রকল্পের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে ক্ষয় করছে। অতীতে রিয়াদের সামনে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার এবং অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানোর সুযোগ ছিল, কিন্তু দেশটি সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি।
আমিন আল-নিমর আরও উল্লেখ করেন, গাজাবাসীর প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইয়েমেনের পরিচালিত সামরিক অভিযান উম্মুর রাশরাশ (ইসরায়েলের ইলাত বন্দর) পর্যন্ত এবং অধিকৃত ভূখণ্ডের অভ্যন্তরেও বিস্তৃত হয়েছিল। এসব ঘটনা সৌদি আরবের অবস্থান পুনর্বিবেচনার জন্য যথেষ্ট সতর্কবার্তা ছিল।
এ ছাড়া ২০১৯ সালে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের হামলা এবং পরবর্তী ঘটনাবলিও রিয়াদের জন্য বড় শিক্ষা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সৌদি শাসকগোষ্ঠী এসব ঘটনা থেকেও প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করেনি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পবিত্র দুই মসজিদের মর্যাদার অপব্যবহার সৌদি সরকারের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের পরিচায়ক
সৌদি আরবের পবিত্র দুই মসজিদ-মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর মর্যাদাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের বিষয়ে আমিন আল-নিমর বলেন, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি সরকারের মিথ্যা অভিযোগ-যে ইয়েমেন মক্কা ও মদিনায় হামলা চালাতে চায়-মূলত দেশটির রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বেরই বহিঃপ্রকাশ।
তাঁর মতে, এসব অভিযোগের মাধ্যমে সৌদি সরকার নিজেদের আগ্রাসনকে বৈধতা দেওয়ার পাশাপাশি নতুন সামরিক ও রাজনৈতিক জোট গঠনের চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, পবিত্র দুই মসজিদের মর্যাদাকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে ব্যবহারের বিষয়টি শুধু সৌদি ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন ক্ষেত্রের ব্যক্তিত্ব, এমনকি দেশটির বিনোদন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংগীতশিল্পীদেরও সৌদি অবস্থানের পক্ষে প্রচারে যুক্ত করা হচ্ছে।
আমিন আল-নিমরের মতে, এ ধরনের প্রচেষ্টা প্রমাণ করে যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে গ্রহণযোগ্য যুক্তি তুলে ধরতে রিয়াদের সরকারি বক্তব্য ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, সৌদি আরবের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের বিরোধিতাকারী কণ্ঠস্বর রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বিশিষ্ট সৌদি আলেম ও যুদ্ধবিরোধী ব্যক্তিত্ব শেখ হুসেইন আল-রাদির কথা উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিরোধিতা করার কারণে শেখ হুসেইন আল-রাদিকে আলে সৌদ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী অন্যান্য কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে গ্রেপ্তার করে। তাঁরা এখনো কারাগারে রয়েছেন এবং তাঁদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
ইয়েমেনের শর্ত মেনে নেওয়া ছাড়া আলে সৌদের সামনে বিকল্প নেই
আমিন আল-নিমর জোর দিয়ে বলেন, সৌদি শাসনব্যবস্থার প্রকৃত চরিত্র স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর দেশটির অভ্যন্তরে এই শাসকগোষ্ঠীর বিরোধিতাকারীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
তিনি বলেন, ইয়েমেনের রাজধানী সানার পক্ষ থেকে যুদ্ধ ও আগ্রাসন বন্ধের শর্তগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট। এসব শর্ত হলো—
১- ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সব ধরনের আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে।
২- ইয়েমেনের ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে।
৩- ইয়েমেনের বিমানবন্দরগুলোতে সৌদি হামলা বন্ধ করতে হবে।
এর বিনিময়ে ইয়েমেনও নিজেদের সামরিক অভিযান বন্ধ করবে।
এই সৌদি বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীর মতে, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসন ও অবরোধ বন্ধ করাই সৌদি আরবের জন্য বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র কার্যকর পথ।
তিনি বলেন, সৌদি আরবের উচিত ছিল যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাসেই নিজেদের হিসাব-নিকাশ নতুন করে পর্যালোচনা করা। তবে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনের জন্য অতীতের ভুল স্বীকার করা এবং সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন।
ইরান সফরকে সৌদি আরবের জন্য নতুন কূটনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখছেন আল-নিমর
সম্প্রতি সৌদি আরবের একটি প্রতিনিধিদলের তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে ইরান সফরের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আমিন আল-নিমর বলেন, এই সফর ইয়েমেনের সংকট থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে সৌদি আরবের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এই সফরের পেছনে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সম্ভাব্য সংঘাত থেকে নিজেদের দূরে রাখার ব্যাপারে রিয়াদের আগ্রহও থাকতে পারে।
তবে তিনি এ বিষয়ে সৌদি আরবের উদ্দেশ্যকে একটি সম্ভাবনা হিসেবেই উল্লেখ করেন।
সানার সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসার আহ্বান
নিজের বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আমিন আল-নিমর বলেন, কূটনৈতিকভাবে সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ খোলা থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবের একগুঁয়েমি ও অহংকারের কোনো যৌক্তিকতা নেই।
তিনি সৌদি কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, অতীতের ভুল ও অহংকার আঁকড়ে না ধরে সরাসরি সানার কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে।
তাঁর মতে, সামরিক সংঘাত ও অবরোধ অব্যাহত রাখার পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোই সৌদি আরবের জন্য সংকট থেকে বেরিয়ে আসার বাস্তবসম্মত পথ।
আপনার কমেন্ট